ডাঃ পেট মোচড় বা কামড়ানো (stomach cramp) কি এবং কেন হয়

অতিরিক্ত তথ্য

বুকের নিচ থেকে তলপেট পর্যন্ত, শরীরের এই অংশে পেট মোচড়ানো বা পেট কামড়ানোর ব্যথা অনুভব করা হয়। আমাদের শরীরে যে পেশী রয়েছে, সেই পেশীর অতিরিক্ত সঙ্কোচনের ফলে পেট মোচড়ানো দেখা দেয়। ক্র্যাম্পের ব্যথা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার আর জীবনে প্রত্যেকেই একবার হলেও এই ধরণের ব্যথা অনুভব করেছেন।
এই ব্যথার তীব্রতা এবং কতবার হতে পারে, তা কয়েক ধরণের কারণের ওপর নির্ভর করে।

পেট মোচড় বা কামড়ানো (stomach cramp) কি এবং কেন হয়

 

 

পেট মোচড়ানোর সাধারণ উপসর্গ কি কি ?

১) হজমের গোলমাল ও খাওয়ার সময় অস্বস্তি বোধ হওয়া।
২) কোষ্ঠকাঠিন্য অথবা ডাইরিয়া (পাতলা পায়খানা হওয়া)।
৩) ঢেকুর ওঠা ও পেট ফাঁপা বা পেটে গ্যাস হওয়া।
৪) বুকজ্বালাভাব বা অম্বল হওয়া ও বমি পাওয়া।
৫) মাইক্রোবিয়াল অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া ঘটিত জীবাণুর সংক্রমণের কারণে জ্বর।

কোন কারণে পেট মোচড়ানো বা কামড়ানো বা ব্যথা  কিভাবে বুঝবেন ???

 

* পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা সাধারণত পেটের ওপর দিকে মাঝখানে শুরু হয়। এটা খালি পেটে বাড়ে, কখনো জ্বালাপোড়ার মতো মনে হয়। পাশাপাশি বমি ভাব, টক ঢেকুর, পেট ফাঁপা ইত্যাদি সমস্যা থাকতে পারে।

* একই জায়গায় বা একটু বাঁ দিকে প্রচণ্ড ব্যথা, যা পেছনে ছড়িয়ে যায় তা কিন্তু গ্যাস্ট্রিকের নয়। এটি অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ হতে পারে। এই ব্যথা তীব্র হয়ে থাকে। ব্যথার সঙ্গে বমিও হতে পারে। অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ একটি বড় সমস্যা।

* অনেক সময় গ্যাস্ট্রিকের মতোই অনুভূত হয় পিত্তথলির ব্যথাও। পেটের ওপরে ডান দিকে বা মাঝে ব্যথা পিত্তথলিতে প্রদাহ বা পাথরের কারণে হতে পারে। এই ব্যথায়ও বমি হতে পারে। তেল–চর্বিযুক্ত খাবার খেলে এটা বাড়ে। যকৃতের প্রদাহেও একই জায়গায় ব্যথা হয়। চিনচিন করে ব্যথা, সঙ্গে জ্বর, জন্ডিস, অরুচি ইত্যাদি হলে বুঝতে হবে হেপাটাইটিস বা যকৃতে প্রদাহ হয়ে থাকতে পারে। যকৃতে ফোড়া হলে এই ব্যথা তীব্র হয়, সঙ্গে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে।

* পেটের ওপরের দিকে ডান অথবা বাঁ কিডনিতে পাথর, প্রদাহ বা সংক্রমণ হলে সেই পাশে ও পেছনে ব্যথা হয়। এই ব্যথা ক্রমেই তলপেটে ছড়ায়। কিডনির ব্যথা খুবই তীব্র হয়, একটু পরপর ছাড়ে, আবার আসে। সঙ্গে বমি, কাঁপুনি দিয়ে জ্বর থাকতে পারে।

* নাভির মাঝখান থেকে ব্যথা যদি ক্রমেই তলপেটের ডান দিকে ছড়িয়ে যায়, সেখানে হাত দিলেই ব্যথা হয়, ধীরে ধীরে তীব্রতা বাড়তে থাকে, তাহলে তা অ্যাপেন্ডিসাইটিস কি না জানতে হবে।

* তলপেটে ব্যথার সঙ্গে প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া ও জ্বর প্রস্রাবের সংক্রমণ নির্দেশ করে। জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের নানা সমস্যায় নারীর এই ব্যথা হতে পারে।

* সাধারণ আমাশয়, ফুড পয়জনিং ও বদহজম থেকে পেটজুড়ে মোচড়ানোর মতো ব্যথা হতে পারে। বমি বমি ভাব, পেটে আওয়াজ, পাতলা পায়খানা ইত্যাদি হয়। আবার কোষ্ঠকাঠিন্য থেকেও পেটে ব্যথা হয়।

পেট মোচড়ানো বা কামড়ানোর সময় কখন ডাক্তার দেখানো খুবই জরুরি ???? 

# পেট ব্যথার সাথে জ্বর হওয়া
# পেট ব্যথার সাথে ঘাম হওয়া,শরীর দূর্বল হয়ে যাওয়া
# প্রস্রাবের সময় যন্ত্রণা এবং বারবার পায়খানা পাওয়া।
# প্রস্রাব অথবা মলের সঙ্গে রক্ত।
# ডিহাইড্রেশন বা শরীরে জলের পরিমাণ কমে যাওয়া।
# খিদে কমে যাওয়া এবং শরীরের ওজন হ্রাস।
# বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তীব্র চিতকার ও বমি করে
# পেট মোচড় বা কামড়ানো (stomach cramp) প্রধান রোগ গুলি কি কি ?
পাকস্থলী, যকৃৎ বা লিভার, বৃক্ক বা কিডনি, অগ্নাশয় অথবা পেটে অবস্থিত যে কোনও অঙ্গে একটি অন্তর্নিহিত চিকিৎসাজনিত অবস্থার কারণে পেট মোচড়ানো অথবা পেট কামড়ানোর সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারণগুলি ছোটোখাটো সংক্রমণের সমস্যা থেকে শুরু করে মারাত্মক অসুখ যেমন ক্যান্সারও সৃষ্টি করতে পারে। পেট মোচড়ানোর সাধারণ কারণগুলি হল:
১) খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণে পাকস্থলীতে সংক্রমণ এবং প্রদাহ (ফুসকুড়ির মতো হওয়া)।
২) বমিভাব এবং গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ বা বদহজম জনিত সমস্যায় অম্বল ও গ্যাস (এক্ষেত্রে পাকস্থলীতে থাকা যাবতীয় জিনিস খাদ্যনালীতে আবার ফেরৎ চলে আসে)।
৩) ঋতুস্রাবের সময় ব্যথা।
৪) দুগ্ধজাতীয় খাবার খেলে অস্বস্তি বোধ বা ল্যাক্টোজ সহ্য না হওয়া (চিনি ও দুধ হজম করতে না পারা)।
৫) কিডনিতে পাথর অথবা পিত্তাশয়ে পাথর।
৬) মলাশয়ে অস্বস্তি বোধ (অন্ত্রে প্রদাহ)।
৭) অ্যাপেন্ডিসাইটিস।
৮) গ্যাস্ট্রিক বা পেটের আলসার বা ঘা।
৯) কোলন অথবা পাকস্থলীতে ক্যান্সার।
পেট মোচড় বা কামড়ানো (stomach cramp) কি এবং কেন হয়
# কিভাবে এটি নির্ণয় করা হয় আর চিকিৎসা করা হয় ?
সঠিক ও কার্যকরী চিকিৎসার জন্য পেট মোচড়ানোর আসল কারণ নির্ধারণ করা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। পেট ব্যথার ধরণ, তার তীব্রতা, যন্ত্রণা কতবার ধরে হচ্ছে, এছাড়াও আরো আনুষাঙ্গিক উপসর্গ শুনে ও দেখে ডাক্তার একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারেন যে ঠিক কি কারণে পেট মোচড়ানো বা পেট কামড়ানোর সমস্যা হচ্ছে।
# পরীক্ষা বা টেস্টের মাধ্যমে কারণ নির্ধারণ করা যেতে পারে:
সংক্রমণ হয়েছে কি না, তা জানার জন্য রক্তপরীক্ষা।
—- জীবাণুর সংক্রমণ, প্রসাবে রক্ত, মলের সঙ্গে পুঁজ বের হওয়া ইত্যাদি
—- আরো বেশ কিছু কারণে প্রসাব ও মল পরীক্ষা।
—- পিত্তাশয় অথবা কিডনিতে পাথর হয়েছে কি না, তা জানার জন্য এক্স-রে করানো।
—- পাকস্থলী এবং ক্ষুদ্রান্তের স্বাভাবিক কাজকর্ম বাধা পাচ্ছে কি না, তা জানার জন্য এন্ডোস্কোপি।
—- কোলনের অবস্থা ঠিক কি রকম পর্যায়ে আছে, তা জানার জন্য কোলোনস্কোপি।
—- কম্পিউটারাইজড টমোগ্রাফি অর্থাৎ সিটি স্ক্যান।
—- আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা।

পেট কামড়ানো কমানোর উপায়

# গ্যাসের মেডিসিন খান

# পেট ব্যথার মেডিসিন ( অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শক্রমে)

 

# আদা খান:

যদি আপনার পেটে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, তাহলে অবশ্যই আদা খান। আদা হজমশক্তি ঠিক রাখতে সাহায্য করে। আদার মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা পেটের ব্যথা কমায়। আদা খাওয়ার জন্য প্রথমে এটিকে সূক্ষ্মভাবে কেটে নিন এবং মধু যোগ করার পর বা মধু না যোগ করে ৩-৪ মিনিট জলে ফুটিয়ে পান করুন। এটি আপনাকে দিনে দুই থেকে তিনবার করতে হবে। এটি আপনাকে পেটের ব্যথায় আরাম দেবে এবং আপনি ভাল বোধ করবেন।

# হিং ব্যবহার করুন:

গ্যাস ও পেটের সমস্যা থাকলে হিং খুবই উপকারী। হিং খেলে বদহজমের সমস্যা ও গ্যাসের সমস্যা চলে যায়। এর জন্য আপনাকে যা করতে হবে তা হল হালকা গরম জল নিয়ে তাতে এক চিমটি হিং দিতে হবে। এবার এই জল দিনে ২ থেকে ৩ বার পান করুন। আপনি চাইলে এতে কিছু সন্ধক লবণও যোগ করতে পারেন। এতে পেটের ব্যথায় আরাম পাওয়া যাবে।

# পুদিনার ব্যবহার:

পেটের ব্যথা উপশমের জন্য পুদিনা খুবই ভালো বলে মনে করা হয়। পুদিনা পেট ঠান্ডা করে এবং হজম সংক্রান্ত সমস্যা দূর করে। বাজারে পাওয়া পুদিনা জলে গুলে পান করতে পারেন। এ ছাড়া শুকনো পুদিনা পাতা জলে সিদ্ধ করে জল ঠান্ডা হলে দিনে ২-৩ বার পান করুন। এতে পেটের ব্যথায় আরাম পাওয়া যাবে।

পেট মোচড়ানোর ক্ষেত্রে নিজে কিভাবে যত্ন নেবেন ?
১) পেট মোচড়ানো বা কামড়ানোর ধরণ অনুযায়ী চিকিৎসার ধরণ নির্ভর করলেও, সাময়িকভাবে অস্বস্তি কমাতে আপনি কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে পারেন। যেমন:
২) অম্বল হতে পারে এমন খাবার এবং মশালদার খাবার এড়িয়ে চলুন। না হলে পাকস্থলী এবং অন্ত্রে যে স্তর রয়েছে, তাতে জ্বালাভাব বাড়বে।
৩) বেশি করে জল খান এবং তরল জাতীয় পানীয় পান করুন। তবে, কার্বনেটেড পানীয় এড়িয়ে চলুন। কারণ, তাতে পেটে আরও গ্যাস তৈরি হবে।
৪) শুতে যাওয়ার আগে ভারি খাবার খাবেন না। ঘুমনোর অন্তত দু’ঘণ্টা আগে রাতের খাওয়া সেরে নিন। তাতে খাবার হজম হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবে।
৫) পেটের পেশীতে অত্যাধিক চাপ পড়ে, এই ধরনের ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন।