একজন ডাক্তার ও তার শিক্ষাজীবন এবং অব্যক্ত বুকচাপা বেদনা

by isk 0 Comments
একজন ডাক্তার ও তার শিক্ষাজীবন এবং অব্যক্ত বুকচাপা বেদনা
আপনার চেম্বার/হাসপাতাল/মেডিকেল প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন

(চট্টগ্রামের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌছে যাক আপনার সেবার বার্তা)

প্রিয়জনের উপকার করুন, শেয়ার করুন-

ইন্টার্নশিপ শেষ করার পর আজব এক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। একসাথে অনেক প্রেশার এসে ঘাড়ে পরেঃ
– প্রেম থাকলে বিয়ে করার প্রেশার। এই সময় অনেক ব্রেকাপ হয়। এইটা অবশ্য মনে হয় সব সাবজেক্ট এর জন্যই সত্য।
– হায়ার স্টাডি করার প্রেশার। হায়ার স্টাডি না করলে সমস্যা। মানুষজন নরমাল এম বি বি এস বলে ডাকে। ৫ বছরের কোর্স আর ১ বছরের ইন্টার্নশিপ করতে গিয়ে গুহ্যের শেপ এবনরমাল হয়ে যায়, তারপরেও মানুষ নরমাল এম বি বি এস ডাকে।
– ফ্যামিলিকে সাপোর্ট দেয়ার প্রেশার। যাদের এই সমস্যা আছে তাদের “কোর্স-ইন্টারকোর্স” কোনটাই করা হয়ে উঠে না।
চাকরীঃ
পাশ করার পর ডাক্তারদের চাকরীর কিছু নির্দিষ্ট সেক্টর আছে।
বিসিএসঃ
সবচেয়ে ভালো অপশন। ২০১৪ তে ৬০০০ ডাক্তার নেয়া হয়েছে। এরপর থেকে সিট খুব কম থাকে।
প্রইভেট মেডিক্যাল কলেজ গুলাতে লেকচারারের পোস্টঃ
এটা খুব হাই ডিমান্ডিং পোস্ট। পলিটিক্যাল বড়ভাই বা মামা-চাচা ছাড়া পাওয়া যায়না। বেতনঃ ১৫০০০-২০০০০। কিছু প্রতিষ্ঠান বেতন কেটে রাখে প্রথম ৬ মাস।
ক্লিনিক ডিউটিঃ
এটা ক্ষেপ নামে পরিচিত। বেতনঃ ৬০০-৮০০ / ডিউটি (৮ ঘন্টা)। জেলা বা থানা পর্যায়ের ক্লিনিকগুলার মালিক সাধারণত নন ডাক্তার। এরকম ৩টা ক্লিনিক এর – একটার মালিক আয়া, আরেকটার মালিক ওয়ার্ড বয়, আরেকজন নিজে পল্লি চিকিৎসক। মানসম্মান বিসর্জন দিয়ে কেন এসব চাকরী করে? এগুলাও পাওয়া যায়না, কষ্টে যোগাড় করতে হয়। “উপায় নাই গোলাম হোসেন”! তবে বিভাগীয় শহরের ভেতরের ক্লিনিকগুলা মোটামুটি ভালো হয়।
এনজিও জবঃ
এগুলা ভালো হয়। সেলারি ভালো। তবে খুব অল্প পোস্ট ও ক্ষণস্থায়ী।
প্রাইভেট চেম্বারঃ
পাশ করার পর পরই চেম্বার শুরু খুব কম মানুষই করে। করলেও রোগী হয়না। অনেকে ফার্মেসীর পেছনে বসে। সেক্ষেত্রে ফার্মাসিওয়ালার বেশী ওষুধ লিখতে বাধ্য করে। অনেকে কোনও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবে বসে। সেক্ষেত্রে তারা টেস্ট দিতে বাধ্য করে। ফার্মেসী বা ল্যাবে না বসলে রোগী পায় না। কারণ ফার্মেসী বা ল্যাবওয়ালাদের দালাল থাকে। তারা রোগী আনে। অনেকে আত্নসম্মান বজায় রাখে, এগুলা করে না। অনেকে বাধ্য হয় করতে।
আরও কিছু টুকটাক অপশন আছে। যেমনঃ
– চা বাগানের ডাক্তারের চাকরী (খুব রিমোট এলাকায় হয়, বর্ডার এ),
– গার্মেন্টস এর ডাক্তার,
– কল সেন্টার এর ডাক্তার,
– কোন প্রোফেসর এর হিস্ট্রি লেখা।
তবে কম্পিটিশন এভ্রিহয়ার। দিন দিন মেডিক্যাল এর সংখ্যা বাড়তেছে তাই কম্পিটিশনও বাড়তেছে। আর তার সাথে সাথে বাড়তেছে সততা আর আত্নসম্মান বিসর্জন দেয়া।
হায়ার স্টাডির অপশনঃ
আমাদের দেশে ৩ ধরনের ডিগ্রী আছেঃ
– এফসিপিএস,
– এমডি /এম এস,
– ডিপ্লোমা।
ডিপ্লোমাঃ
যারা কম সময়ে ডিগ্রী করতে চায় তারা এইটা করে। চান্স পাওয়া কঠিন। ভর্তি পরীক্ষায় ভালোই কম্পিটিশন হয়। ডিপ্লোমাগুলা ২ বছরের কোর্স হয়। এই ২ বছর ফুল টাইম ডিউটি করতে হয়। কোনও টাকা দেয়া হয়না এবং এসময় বাইরে কাজ করা নিষেধ। তাইলে এই ২ বছর কি খায়ে বাঁচে? এসময় ফুল টাইম হাসপাতালে ডিউটির পাশাপাশি চিপায় চাপায় ক্লিনিক ডিউটি করে অথবা কোথাও চেম্বার করে। চেম্বার করার ক্ষেত্রে আবার সেই ফার্মেসী বা ল্যাব ই ভরসা। ডিপার্টমেন্ট এর প্রোফেসর যদি খোঁজ পায় যে চেম্বার করে তাহলে গোস্বা করে। অবশ্য, যারা বিসিএস ডাক্তার তারা সরকারী বেতনটা পায়। কিন্তু বেশীরভাগই মাগনা কামলা। ২ বছর শেষ হওয়ার পর ফাইনাল পরীক্ষা দেয়া শুরু হয়। ফাইনালে পাশ করার রেট কম। ৬ মাস পর পর পরীক্ষা হয়। পাশ করতে করতে আরও ১-৩ বছর লাগে।
এফসিপিএসঃ
এই ডিগ্রীটা দেয় বিসিপিএস নামের একটা প্রতিষ্ঠান। এই ডিগ্রী একমাত্র বাংলাদেশ আর পাকিস্তানে আছে এবং বাংলাদেশের বাইরে অন্য কোনও দেশে এইটার কোনও রিকগনিশন নাই। চান্স পাওয়া অনেক টাফ। বছরে ২ বার ভর্তি পরীক্ষা হয়। হাজার হাজার পুলাপান পরীক্ষা দেয়। কয়েকশ পাস করে। পরীক্ষা দিতে এখন মনে হয় ১০ বা ১১ হাজার টাকা লাগে। পরীক্ষা ফি বাবদ বিসিপিএস এর ভালো একটা ইনকাম হয়। এই পরীক্ষায় পাস করলে নেক্সট স্টেপ হল আরও ৩ বছর কামলা খাটা + ১ বছর কোর্স।
যাদের বিসিএস আছে তারা এসময় বেতন পায়। তবে তারা চাইলেই কোর্স শুরু করতে পারেনা। মন্ত্রণালয়ের অর্ডার হলেই কেবল আসতে পারে। বিসিএস ধারীদের সংখ্যা কম থাকে। মাগনা কামলারাই বেশী। মাগনা কামলাদের “অনারারী মেডিক্যাল অফিসার” বলা হয়। আমরা বলি “অনাহারী”। সরকারী হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার লেভেল এ যারা থাকে তাদের বেশীরভাগই অনাহারী। তাদের কেও ফুল টাইম ডিউটি করতে হয়। আবার পাশাপাশি পেটের ধান্দাও করতে হয়। so তাদের মুখ দিয়ে যে মধু বের হবেনা এইটাই স্বাভাবিক। কথা যে কয় সেইটাই তো বেশী। ৩ বছর বেতন ছাড়া ফুল টাইম চাকরীর সিস্টেম একমাত্র আমাদের দেশেই আছে।
এফসিপিএস এ ফাইনাল পরীক্ষার পাশের রেট বড়জোর ৫%। বড় স্যাররা কম্পিটিশন পছন্দ করেন না। ট্রেইনিং শেষ করার পর পাশ করতে করতে আরও ১-৪ বছর লাগে। কারও কারও আরও বেশী।
পাশ করার পর ৪০০/৫০০ টাকা ভিসিট নিলে মানুষ গালি দেয়। বলে যে কলম দিয়ে ২ টা ওষুধের নাম লিখেই ৫০০ টাকা নিলো। ডাক্তার খারাপ। আর এই কথাগুলা বেশীরভাগ সময়ই সামর্থ্যবান লোকরা বলে। আমার ফ্যামিলির লোকরাও বলে, আমারেই বলে।
এমডি / এম এসঃ
এগুলাতেও সেম সিস্টেম। তবে চান্স পাওয়া আরও টাফ। কারণ সিট লিমিটেড। তাছাড়া এটায় কিছু টাকা দেয় (১০,০০০)। তাই এটার ডিমান্ড বেশী। তবে সেই টাকা নিয়েও অনেক ঝামেলা হইছে এতদিন। পাশ করে বের হতে হবে ৬ বছরের মত লেগে যায়। এইটা নিয়ে আসলে ভালো আইডিয়া নাই।
শেষকথাঃ
লেবু বেশী চিপলে তিতা হয়ে যায়। ডাক্তারদের সমস্যাগুলা কেও কখনো জিজ্ঞাসাও করে না, solve করাতো দূরে থাকুক। সো, ডাক্তাররা তিতা হয়ে গেছে।
দিন দিন চাকরীর সুযোগ কমে আসতেছে। অনেকে বিদেশে চলে যাচ্ছে এবং এটার টেন্ডেন্সি সামনে আরও বাড়বে। এসব ইনফরমেশন এভেইলেবল এখন। সামনে একটা সময় আসবে যখন ভালো পুলাপান মেডিক্যাল এ ভর্তি হবেনা। আর হলেও পাশ করার পর বিদেশ চলে আসবে। দেশে থাকবে শরীফ মেলামাইন, আর মার্কস গুড়া দুধের প্রোডাক্টরা।
টাকলাদের চিন্তা নাই। তারা চিকিৎসা করায় সিঙ্গাপুরে। ক্ষমতাশীল দলের পাতিনেতা হইলেও সমস্যা নাই, তারা হাসপাতালে ভালোই খাতির আদায় কইরা নেয়। তাদের জন্য ফোন আসে। যাদের টাকা আছে তাদেরও সমস্যা নাই। ইন্ডিয়া যাবে বা স্কয়ার-এপোলো তে দেখাবে। সমস্যা হবে মেঙ্গো পিপুল এর। তারা চিকিৎসার অভাবে হয়ত মারা যাবে।
2017
SZMC-4
(ডা: মো: শরিফুল ইসলাম সুজন)
Reference: www.facebook.com

প্রিয়জনের উপকার করুন, শেয়ার করুন-

Leave a reply

Your email address will not be published.

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>