কোমরের ডিস্ক সরে যাওয়া বা সায়াটিকা ব্যথা

কোমরের ডিস্ক সরে যাওয়া বা সায়াটিকা ব্যথা

প্রিয়জনের উপকার করুন, শেয়ার করুন-

শুরুতে কোমরে ব্যথা, এরপর ব্যথা পায়ে নামে। এর সাথে পায়ে কামড়ানো, ঝিঝি, আবশভাব ইত্যাদি। এটি খুব কমন সমস্যা কিন্তু খুবই কষ্টদায়ক। এই সমস্যাটিকে বলা হয় সায়াটিকা ব্যথা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে সারা বিশ্বে ৭০ ভাগ লোক জীবনে কোনো না কোনো সময় কোমর ব্যথায় আক্রান্ত হয়, তার মধ্যে ৪০ ভাগ লোক সায়াটিকা ব্যথায় ভোগেন। এই ব্যাথার অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হল মেরুদন্ডের কোমরের অংশের ডিস্ক বা নরম হাড় সরে গিয়ে নার্ভ বা স্নায়ুতে চাপ দেয়া।

সায়াটিকা ব্যথা কি ?

মানবদেহে সায়টিক নার্ভ নামে একটি স্নায়ু রয়েছে, যা মেরুদণ্ডের কোমরের অংশ থেকে উৎপত্তি হয়ে ঊরুর পেছন দিক দিয়ে হাঁটুর নিচের মাংসপেশির মধ্য দিয়ে পায়ের আঙুল পর্যন্ত বিস্তৃত। যখন কোনো কারণে এই নার্ভ বা স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে তখন কোমর থেকে পায়ের নিচ পর্যন্ত ব্যথা ছড়িয়ে যায়, এটাকে ডাক্তারি ভাষায় সায়টিকা বলা হয়।

সায়াটিকা ব্যথার কারণ কি ?

সাধারণত সায়াটিকার মূল কারণসমূহ —
১. পিএলআইডি বা কোমরের ডিস্ক বা নরম হাড় সরে গেলে
২. লাম্বার স্পন্ডাইলোসিস বা কোমরের বয়সজনিত ক্ষয়বাত
৩. লাম্বার স্পনডাইলোলিসথেসিস বা কোমরের কশেরুকা বা শক্ত হাড় সরে গেলে
৪. লাম্বার স্পাইনাল স্টেনসিস বা শাহী রগের চলাচলের পথ সরু হয়ে গেলে
৫. পিরিফর্মিস সিনড্রোম বা পিরিফর্মিস নামক মাংসপেশিতে টান পড়লে

কাদের হয় ?

→পুরুষ বা মহিলা উভয়ই আক্রান্ত হতে পারে
→বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৫০ এই বয়সে রোগটি প্রথম ধরা পড়ে

কারা ঝুঁকিতে আছেন ?
→যারা সাধারণত কোমর সামনে ঝুঁকিয়ে কাজ করেন। যেমন-
ভারি জিনিস উঠানো, ঝাড়ু দেয়া, টিউবওয়েল চাপা ইত্যাদি
→যারা একনাগাড়ে বসে কাজ করেন, যেমন –
অফিসে কাজ, কম্পিউটারের কাজ, সেলাই করা ইত্যাদি।
→কোমরের ঝাঁকুনি হয় এমন কাজ। যেমন-
মোটরসাইকেল বা সাইকেলে ব্যবহার, দীর্ঘ ভ্রমণ ইত্যাদি।

কোমরের ভিতরে কি আছে?

সায়াটিকা ব্যথা বুঝার জন্য কোমরের গঠন সম্পর্কে কিছুটা জ্ঞান থাকা জরুরী।
কোমরের গঠনকারী উপাদান সমুহ হল-
– শক্তহাড় বা কশেরুকাঃ কোমরে সাধারণত ৫টি কশেরুকা বা শক্ত হাড় থাকে
– নরম হাড় বা ডিস্কঃ দুই কশেরুকার মাঝখানে ডিস্ক বা নরম হাড় থাকে,
– শাহী রগ বা কর্ডঃ কশেরুকার মধ্যবর্তী স্থানে স্পাইনাল কর্ড বা শাহী রগ থাকে
– স্নায়ু বা নার্ভঃ কশেরুকার দুই দিক দিয়ে স্পাইনাল কর্ড হতে নার্ভ বের হয়ে পায়ে
পৌঁছায়

সায়াটিক ব্যথা কিভাবে হয় ?

→অনেক সময় কোমরের অসতর্ক ব্যবহারের কারণে, কোমরের ডিস্ক বা নরম হাড়ের উপর অস্বাভাবিক চাপ পড়ে।
→ফলে নরম হাড় ফেটে বা সরে গিয়ে সায়াটিক নার্ভের মূলগুলোকে চাপ দেয়।
→তাই কোমর ব্যথা সায়াটিক নার্ভ বেয়ে ঊরুর পেছনে, হাঁটুর নিচের মাংসপেশিতে, এমনকি পায়ের তলা ও আঙুল পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়।

উপসর্গ সমুহ কি কি ?

→কোমর নাড়াতে, ঘুরাতে তীব্র ব্যথা লাগা
→সামনে ঝুঁকে কাজ করার সময় ব্যথা তীব্র হয়
ব্যথা ঊরুর পেছনে, হাঁটুর নিচের মাংসপেশিতে, এমনকি পায়ের তলা ও আঙুল পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়
→কিছুক্ষণ হাঁটলে বা দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যথা ও ঝিঝি বাড়ে, বসলে আবার কমে যায়
→আক্রান্ত পায়ে পা সির সির্, অবশ ভাব, ভার ভার, সূচ ফোটানোর অনুভুতি লাগা
→হাঁচি বা কাশি দিলে, পায়খানা কষা হলে ব্যথা বেড়ে যায়

কিভাবে সায়াটিকা রোগ নির্ণয় করা হয় ?

– রোগের ইতিহাস জানা এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কর্তৃক নিজ হাতে কোমর ও পায়ের শারীরিক পরীক্ষা করা জরুরী। এর সাথে নিশ্চিতকরণ ও অন্য রোগ থেকে আলাদা করার জন্য আরও কিছু পরীক্ষা প্রয়োজন। যেমনঃ
→ রক্ত পরীক্ষা
→ কোমরের এক্স-রে
→ কোমরের এম,আর,আই
→ কোমরের সিটিস্ক্যান
→ এন,সি,এস; ই,এম,জি
→ বি,এম,ডি
→ হাড়ের স্ক্যানিং ইত্যাদি

চিকিৎসা কি ?

সায়াটিক ব্যথার চিকিৎসা সাধারণত তিন ধাপে করা হয়।
১ প্রাথমিক বা কনজারভেটিভ চিকিৎসা
২ ইন্টারভেনশন (ইঞ্জেকশন) চিকিৎসা
৩ অপারেশন (সার্জারী)

আসুন একটু বিস্তারিত জানা যাক…………

১) প্রাথমিক বা কনজারভেটিভ চিকিৎসাঃ
প্রাথমিকভাবে নিচের বিষয়বস্তু গুলোর সমন্বনয়ে চিকিৎসা শুরু করা হয়,
-জীবনধারা পরিবর্তন
-ফিজিওথেরাপি
-ব্যায়াম
-ঔষধ

জীবনধারা পরিবর্তনের পরামর্শঃ
o ফোম বা বেশী নরম বিছানায় শুবেন না
o কোমর বাঁকা বা নরম করে কোন কাজ করবেন না
o সামনে ঝুঁকে ভারী কিছু তুলবেন না
o তীব্র ব্যথা থাকা অবস্থায় চেয়ারে নামায পরবেন
o বাথরুমে হাই কমোড বা চেয়ার কমোড ব্যবহার করুন
o বেশী ব্যাথা থাকা অবস্থায় ব্যায়াম করবেন না
o শোয়া থেকে উঠার সময় একদিকে কাত হয়ে হাতে ভর দিয়ে উঠবেন
o চেয়ারে সোজা হয়ে বসে কাজ করবেন
o বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে থাকবেন না
o ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় ভ্রমণ করবেন না
o কাজের সময় বা ভ্রমণের সময় কোমরের বেল্ট ব্যবহার করবেন

ফিজিওথেরাপিঃ এটি একটি আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। বয়স্কদের যেহেতু এই রোগ বেশি হয় সেহেতু ওষুধের ব্যবহার যত কম করা যায় তত ভালো। একজন ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ রোগীর সার্বিক অবস্তা বিবেচনা করে ফিজিওথেরাপির পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
যেমনঃ
→শর্ট-ওয়েভ থেরাপি,
→টানা বা ট্রাকশন থেরাপি
→আলট্রাসাউন্ড থেরাপি
→নার্ভ ইষ্টিমুলেশন থেরাপি, ইত্যাদি

ব্যায়ামঃ কোমরের পেশির কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট ব্যায়ামগুলো জরুরী
যেমনঃ
→কোমরের মাংস পেশীর বলকারক ব্যায়াম,
→কোমরের মাংস পেশীর প্রসারণকরন ব্যায়াম, ইত্যাদি।

ঔষধঃ রোগীর সার্বিক অবস্তা বিবেচনা করে ঔষধের পরামর্শ দেয়া হয়।
যেমনঃ
ব্যথানাশক ঔষধঃ—প্যারাসিটামল, এন,এস,এ,আই,ডি ইত্যাদি।
মাংশপেশী শিথিল করার ঔষধ, দুশ্চিন্তা কমানোর ঔষধ ইত্যাদি।

২) ইন্টারভেনশন (কোমরে ইঞ্জেকশন)
এটিকে বলা হয় ব্যথানাশক এপিডুরাল ইনজেকশন। অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে মেশিনের মাধ্যমে কোমরের জয়েন্টের ভিতরে নার্ভ বা স্নায়ুর গোঁড়ায় ব্যথানাশক এই ইনজেকশন দেয়া হয়। ফলে স্নায়ুমূলের উত্তেজনা কমে যায়, যা কোমরের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।

৩) অপারেশন (সার্জারী)

সম্পাদনায় ———————————-
ডাঃ মোঃ মাহফুজুর রহমান
এমবিবিএস, এফসিপিএস ( ফিজিক্যাল মেডিসিন )
বাত-ব্যথা, মেরুদণ্ড-জয়েন্ট রোগ ও আরথ্রাইটিস বিশেষজ্ঞ
কনসালটেন্ট, পার্কভিউ হসপিটাল প্রাঃ লিঃ, চট্টগ্রাম
যোগাযোগঃ ০১৩১২ ৩৯ ৫৬ ৩৮


প্রিয়জনের উপকার করুন, শেয়ার করুন-

Leave a reply

Your email address will not be published.

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>